ঢাকা : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর সহস্রাধিক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে পুলিশের গুলিতে। কয়েক বছর ধরে অব্যাহত আছে এই ধারা। মিনেসোটা রাজ্য প্রশাসনও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশের বিরুদ্ধে। দেশটির জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক পুলিশের গুলিতে নিহত বা আহত হন। এই হতাহতের সংখ্যা শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে তিনগুণ বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশের বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নৃশংসতা নিয়ে সারা বিশ্বেই ব্যাপক হতাশা ও ক্ষোভ রয়েছে। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন পুলিশের হাতে বিচারবহির্ভূত উপায়ে কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার প্রতিবাদে বিশ্বজুড়ে বহু প্রতিবাদ-বিক্ষোভও হয়েছে।
সারা বিশ্বে মানবাধিকার রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত সোচ্চার। মানবাধিকারের পাশাপাশি গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নিশ্চিতে নিজেদের সক্রিয় দেখাতে নানা তৎপরতা প্রদর্শন করে দেশটি। তবে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৭ বছরে পুলিশের গুলিতে সাড়ে ৭ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। অনেকটা একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনেও।
তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডে ২০২০ সালের ১ জুন প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৭ বছরে পুলিশের গুলিতে ৭ হাজার ৬৬৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৩ সালে পুলিশের গুলিতে ১ হাজার ১০৬ জন, ২০১৪ সালে ১ হাজার ৫০ জন, ২০১৫ সালে ১ হাজার ১০৩ জন, ২০১৬ সালে ১ হাজার ৭১ জন, ২০১৭ সালে ১ হাজার ৯৫ জন, ২০১৮ সালে ১ হাজার ১৪৩ জন এবং ২০১৯ সালে ১ হাজার ৯৮ জন নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে যে ৭ বছরের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে তার মধ্যে ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ ১ হাজার ১৪৩ জন পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। আর ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পুলিশের গুলিতে বছরে গড় প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় ১১০০ জন।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে কমপক্ষে ১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি কৃষ্ণাঙ্গ পুলিশের গুলিতে হতাহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যানে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু অথবা অন্য পদ্ধতিতে নিহত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
এছাড়া ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক অসম হারে পুলিশের গুলিতে নিহত বা আহত হয়েছেন, যা একইভাবে হতাহত শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে অন্তত তিনগুণ বেশি। অবশ্য বছরের পর বছর ধরে চলা মার্কিন পুলিশের এই নৃশংসতা ও বর্বরতার কারণে বাহিনীটির সংস্কার দাবিতে বহুবার বিক্ষোভ হয়েছে, এমনকি বিশ্বজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে বিতর্কও।
অনেকটা একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের পরিসংখ্যানেও। ২০১৪ সালে মাইকেল ব্রাউন নামে নিরস্ত্র এক কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর থেকে প্রভাবশালী এই মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের হিসাব রাখা শুরু করে।
২০১৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা টানা চার বছর ধরে এক হাজারের আশপাশেই রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে পুলিশের গুলিতে ৯৯৮ জন নিহত হয়েছিলেন। ২০১৭ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ৯৮৭।
অর্থাৎ ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে ১১ জন বেশি মারা গেছে। এছাড়া ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে নিহত মানুষের সংখ্যা ৯৬৩ জন এবং ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯৯৫ জন।
প্রভাবশালী এই মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি বলছে, বছরজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার এই তথ্যগুলো বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং পুলিশ প্রতিবেদন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
এ ছাড়া টানা ৫ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য, প্রতিবছর গোলাগুলির ঘটনার মোট সংখ্যা এবং নিহত মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক একই জায়গায় স্থির রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো মানুষের মধ্যে ৯৫ শতাংশই পুরুষ। নিহতদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি মানুষের বয়স ২০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। প্রতিবেদন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যেই পুলিশের গুলিতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে নিউ মেক্সিকো, আলাস্কা ও ওকলাহামা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা রাজ্য প্রশাসন সেদেশের পুলিশের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করে ২০২০ সালের ২ জুন। পুলিশ হেফাজেতে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনায় এ অভিযোগ আনা হয়। মিনেসোটার ওই পুলিশ ডিপার্টমেন্টের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর এবং বৈষম্যমূলক আচরনের অন্যান্য অভিযোগ রয়েছে।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ সম্প্রতি তার এক বক্তব্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রেই চরমভাবে মানবাধিকারের লঙ্ঘন হয়। তিনি জানান, চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের নির্যাতন এবং প্রক্রিয়াগত বর্ণবাদী বৈষম্য বন্ধে মার্কিন সরকারের প্রতি আহবান জানায়। তিনি আরো বলেন, অক্টোবরে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার এক নিবন্ধে বলা হয়, ১৯৮০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশি হেফাজতে যতো মানুষের মৃত্যু হয়েছে তার মধ্যে ৫৫ শতাংশ মৃত্যুই ‘আনরিপোর্টেড’ অথবা ‘মিসলেবেলড’, অর্থাৎ এসব মৃত্যুর কথা ও আসল কারণ জানানো হয়নি।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় পুলিশ একজন কৃষ্ণাঙ্গের গলায় হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে মেরে ফেলার মর্মান্তিক দৃশ্য বিশ্ববাসী আজও ভোলেনি উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, শুধু তাই নয়, ফিলিস্তিনের শিশুরা তাদের বাড়িঘরে হামলাকারী ইসরাইলিদের ওপর ঢিল ছুড়লে ইসরাইলি বাহিনী তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। যুক্তরাষ্ট্র সেই ইসরাইলিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। বরং জাতিসংঘে কোনো দেশ যদি এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব দেয়, যুক্তরাষ্ট্রই তার বিরোধিতা করে ভেটো দেয়।
সোনালীনিউজ/এমটিআই