ঢাকা : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতি বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়ার পাশাপাশি, খেলাধুলার জগতেও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ, স্পনসরশিপ ও বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত স্পোর্টস ইন্ডাস্ট্রি নতুন এই শুল্ক নীতির কারণে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ক্লাব মালিক, স্পনসর ও ভোক্তাদের জন্য এটি নতুন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইংলিশ ফুটবল ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অন্যতম শেয়ারহোল্ডার স্যার জিম র্যাটক্লিফ। তার মালিকানাধীন গাড়ি কোম্পানি আইনিওস অটোমোটিভ ইউরোপে উৎপাদিত গাড়ি যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে থাকে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ২৫% শুল্ক নীতি কোম্পানির জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইনিওসের প্রধান নির্বাহী লিন ক্যালডার বলেন, ‘আমরা শুল্কের কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছি এবং জরুরি ভিত্তিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’
যুক্তরাষ্ট্রে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিশাল ফ্যানবেস থাকলেও মুদ্রার মান পরিবর্তনের ফলে ক্লাবের ঋণের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। ফুটবল ফাইন্যান্স বিশ্লেষক কিয়েরান ম্যাগুয়ের বলেন, ‘ইউনাইটেডের প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ রয়েছে, যা নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত। যদি শুল্কের কারণে মার্কিন ডলারের মান বৃদ্ধি পায়, তাহলে পাউন্ডের তুলনায় ঋণের পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে। এটি ক্লাবের আর্থিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।’
আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বেশ কিছু বড় ক্রীড়া ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হবে, যার মধ্যে রয়েছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ও ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকস।
বিশ্বকাপে স্পনসর হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই গ্রুপের মতো কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছিল। তবে ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির কারণে অনেক স্পনসর পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হতে পারে।
স্পোর্টস ইভেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট জন জেরাফা বলেন, ‘যদি যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা করাই কঠিন হয়ে যায়, তাহলে কেন একটি কোম্পানি সেখানে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে?’
এছাড়া, নাইকি, অ্যাডিডাস, পুমার মতো ক্রীড়া সামগ্রী নির্মাতারা মূলত এশিয়া থেকে কাঁচামাল আমদানি করে। ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতির ফলে এই কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে ভোক্তাদের ওপরও। তবে ম্যাগুয়ের মনে করেন, এর প্রভাব খুব বেশি হবে না, ‘একটি ১০০ ডলারের স্পোর্টস জার্সি উৎপাদনে মূল খরচ হয় মাত্র ১২-১৫ ডলার। যদি নতুন ৪০% শুল্ক আরোপ করা হয়, তাহলে উৎপাদন খরচ মাত্র ৪ ডলার বাড়বে। ভোক্তারা সাধারণত ক্রীড়া সামগ্রীর জন্য বেশি দাম দিতেই অভ্যস্ত, তাই বিক্রির পরিমাণ তেমন কমবে না।’
ট্রাম্পের শুল্ক নীতি ও বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্টেও প্রভাব পড়তে পারে। আগামী অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য রাইডার কাপ গলফ টুর্নামেন্টে আমেরিকান দর্শকদের মধ্যে ইউরোপবিরোধী মনোভাব বাড়তে পারে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, এই দুই দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যে ২৫% শুল্ক আরোপ করা হবে। তিনি বলেন, ‘এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন বিশ্বকাপকে আরও রোমাঞ্চকর করবে। উত্তেজনা থাকা ভালো!’
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বাণিজ্য যুদ্ধ বিশ্বকাপ আয়োজনের নিরাপত্তা ও ভিসা নীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জন জেরাফা বলেন, ‘একটি দেশ ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজন করে নিজেদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বন্ধুত্বপূর্ণ ভাবমূর্তি তুলে ধরতে। কিন্তু ট্রাম্পের নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বকে উন্মুক্ত বার্তার বদলে নেতিবাচক সংকেত দিচ্ছে।’
বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করে এনবিসি স্পোর্টসের মাধ্যমে। তবে এটি একটি সার্ভিস হওয়ায় সরাসরি শুল্কের আওতায় পড়বে না। তবে ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি মার্কিন অর্থনীতিতে মন্দার প্রভাব পড়ে, তাহলে দর্শকদের টিকেট ও টিভি সাবস্ক্রিপশনে খরচ করার সামর্থ্য কমে যেতে পারে।
ট্রাম্পের শুল্ক নীতি শুধুমাত্র বাণিজ্যের জন্যই নয়, বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের জন্যও বড় এক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, এই নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিশ্বের ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীরা কীভাবে নিজেদের মানিয়ে নেয়।
এমটিআই
আপনার মতামত লিখুন :